বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬
৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়েছে ১০৪ বাংলাদেশি, তাদের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

মঙ্গলবার ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

“আমাকে কৌশলে যুদ্ধে জড়ানো হয়’: ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশি পুরুষদের জোরপূর্বক পাঠানো ও মানবপাচারের ঝুঁকি” শীর্ষক ৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে প্রতারণা, বলপ্রয়োগ ও নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশি পুরুষদের কীভাবে ইউক্রেনে সম্মুখসমরে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে সেসব তুলে ধরা হয়েছে।

বেঁচে যাওয়া ভুক্তভোগীদের রক্ষা করতে ও সংশ্লিষ্ট মানবপাচার চক্র ভেঙে দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে শুরু হওয়া রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন এখনও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। এর সুযোগ নিয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল পুরুষদের টার্গেট করে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে রাশিয়ায় মানব পাচারের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।

দালাল চক্র মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে—যেমন নিরাপদ চাকরি বা বেসামরিক কাজের সুযোগ—এদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে সরবরাহ করছে। সরবরাহকৃতদের মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন, যাদের সম্মুখসমরে পাঠানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে মানবপাচার বলা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে ফর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলে বলেন, “প্রতারণার মাধ্যমে পাচারপূর্বক বাংলাদেশি পুরুষদের ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধ যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা সম্ভবত আমরা যা নথিবদ্ধ করতে পেরেছি তার চেয়েও অনেক বেশি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।”

ট্রুথ হাউন্ডস-এর নির্বাহী সহপরিচালক ওকসানা পোকালচুক বলেন, “আমরা দেখেছি, কীভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জাতিগত বৈষম্যের শিকার এমন পুরুষদের রাশিয়া তার যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। রাশিয়া তার পক্ষের প্রাণহানিতে বিদেশি নাগরিকদেরও জড়াচ্ছে। এটি রাশিয়ার যুদ্ধে নিছক মানব-সরবরাহের ঘটনা নয়, বরং সর্বোচ্চ মাত্রার শোষণে ররূপ নিয়েছে।”

মানবাধিকার সংগঠন দুটির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মানবপাচারকারী দালাল চক্র প্রথমে ভুয়া কাজের কথা বলে ভুক্তভোগী বাংলাদেশি পুরুষদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করে। তারপর রুশ ভাষায় লিখিত চুক্তিপত্রে তাদের সাক্ষর করায়, যেটি ভুক্তভোগীরা পড়তেও পারে না। এরপর তৃতীয় একটি দেশের মধ্য দিয়ে তাদের পাচার করে দ্রুত রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে ইউক্রেনে গিয়ে রাশিয়ার পক্ষে সৈন্য হিসেবে যুদ্ধ করতে তাদের বাধ্য করা হয়েছিল।

বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগী একজন বলেছেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোরর সঙ্গে সঙ্গে তাকে জানানো হয় যে, তাকে “ক্রয়” করা হয়েছে যুদ্ধ করার জন্য।

অনুসন্ধানে আরও কয়েকটি ঘটনায় জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়া তথা শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে কিছু পুরুষ রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে সামরিক দায়িত্বের জন্য স্বেচ্ছায় সাক্ষর করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে নির্যাতনমূলক পরিবেশে তাদের থাকতে হয়েছে। তথ্য বলছে, শ্রীলঙ্কা থেকে ৭৫১, নেপাল থেকে ৮৫১, ভারত থেকে ১৭০ জন যুদ্ধে গিয়েছেন। তাদের মধ্যে শ্রীলংকার ২৭৫ জন, নেপালের ১১৬ জন এবং ভারতের ২৩ জন মারা গেছেন।

২০২৫ সালের মে ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস বাংলাদেশ ও ইউক্রেনে ২৪টি সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছে। এরমধ্যে বাংলাদেশি পুরুষদের সাক্ষাৎকারও রয়েছে, যাদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া পাচার থেকে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশি ভুক্তভোগী ও নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী ও পাচারবিরোধী সহায়তা প্রদানকারীদের সঙ্গেও কথা বলেছে তারা। এছাড়া ট্রুথ হাউন্ডস ইউক্রেনে চারজন নেপালি ও শ্রীলঙ্কান যুদ্ধবন্দির সাক্ষাতকার নেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধবন্দিদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ইউক্রেন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।

প্রতিবেদনে তারা বাংলাদেশ, ইউক্রেন ও রাশিয়ার সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে কিছু সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো, পাচার থেকে বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগীদের সাহায্য করা, বলপূর্বক ও অবৈধভাবে জনবল সরবরাহ ঠেকানো এবং রাশিয়ার আগ্রাসী যুদ্ধে মানবপাচার বন্ধ করা। যদিও প্রতিবেদনটি মূলত বাংলাদেশভিত্তিক মানব পাচারের ওপর দৃষ্টি রাখে, প্রাপ্ত তথ্য ও সুপারিশগুলো আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় রাশিয়া কেন্দ্রিক মানব পাচারের অন্য ঘটনায়ও প্রাসঙ্গিক।

বেঁচে যাওয়া কিছু ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, কোনও উল্লেখযোগ্য প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। স্থলমাইন ও ড্রোন আক্রমণে কেউ কেউ আহত হয়েছেন। কিছু ভুক্তভোগী কমান্ডারদের মারধরের শিকার হয়েছেন। তাদের বেতন আটকে রাখা হয়েছে এবং কোনও ছুটিও দেওয়া হয়নি। এমনকি পাসপোর্টও জব্দ করা হয়েছিল। পালানোর চেষ্টা করলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো।

বাংলাদেশ থেকে তাদের পরিবার ঋণ নিয়ে তাদের বিদেশে পাঠিয়েছে। ফলে তারা হাজার হাজার ডলারের সমপরিমাণ ঋণে ডুবে আছে। বাংলাদেশে বসে পরিবারগুলো বৈদেশিক যুদ্ধক্ষেত্রে ছেলে বা স্বামীর নিহত হওয়ার খবর পায়। প্রিয়জনকে বিদেশে পাঠাতে ঋণ নিয়ে পরিবারের ওপর শোক ও আর্থিক চাপ মিলিয়ে গেছে।

Leave A Reply

Exit mobile version