সোমবার, মার্চ ২, ২০২৬
১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সামরিক চাপের মুখে তেহরানের ক্ষমতাধর বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার এক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, তার বাহিনীর ‘আঙুল এখন ট্রিগারে’ রয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তেই তারা শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল নৌবহর উপসাগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানের মধ্যেই বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে লক্ষ্য করে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, বিপ্লবী গার্ড এবং প্রিয় ইরান এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। আমাদের আঙুল ট্রিগারে এবং যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা এখন বেশি প্রস্তুত।

জেনারেল পাকপুর গত বছরের ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেন কোনো ভুল হিসাব না করে। যদি তারা আবারও কোনো দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের আগের চেয়েও ‘যন্ত্রণাদায়ক ও বেদনাদায়ক’ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) থেকে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর কড়া নজর রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

ট্রাম্প বলেন, আমরা চাই না বড় কোনো সংঘাত ঘটুক, তবে আমরা তাদের ওপর কড়া নজর রাখছি। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশাল নৌবহর পারস্য উপসাগরের দিকে পাঠাচ্ছে। এর আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছিলেন।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, যদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বার্থের ওপর আঘাত আসে, তবে ওয়াশিংটন ইরানকে ‘পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেবে’।

ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ইরানে শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের নজিরবিহীন বিক্ষোভ আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যদিও বর্তমানে আন্দোলনটি কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, তবে এর ক্ষত রয়ে গেছে গভীরে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মাধ্যমে দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এ বিক্ষোভের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।

তার মতে, তারা কাপুরুষের মতো ১২ দিনের যুদ্ধে হেরে যাওয়ার প্রতিশোধ নিতে এখন দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
L
গত বছরের জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ফলে ১২ দিন ধরে এক ভয়াবহ সংঘাত চলেছিল। সেই সংঘাতের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প সবসময়ই টেবিলে রেখেছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই সামরিক সম্ভাবনার পালে আবারও হাওয়া দিচ্ছে। উভয় পক্ষ একে অপরকে চরম হুঁশিয়ারি দিলেও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সুযোগ নেওয়ার কথাও আলোচিত হচ্ছে।

ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, তেহরান এখনো আলোচনার টেবিলে বসার আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এমন রণংদেহী মনোভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল নৌবহর মোতায়েনের খবর কূটনীতির পথকে সংকীর্ণ করে তুলছে।

পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরের উপস্থিতি এবং ইরানের ‘ট্রিগারে আঙুল’ রাখার ঘোষণা বিশ্ববাসীকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদি কোনো এক পক্ষের সামান্য ভুল বা উসকানি ঘটে তবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে।

আপাতত বিশ্বনেতাদের নজর এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের এ ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্ব বাজারে তেলের দামে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

Leave A Reply

Exit mobile version