বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬
৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উত্তপ্ত হাওয়া। নির্বাচনের ফলাফল এবং এর পেছনের প্রক্রিয়ায় ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কারচুপির গুরুতর অভিযোগ তুলে এবার সরব হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলটির দাবি, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এই প্রক্রিয়ার বিষয়ে অনেক গোপন তথ্য জানেন, যা জাতির সামনে উন্মোচন করা জরুরি। সাবেক এই উপদেষ্টার বক্তব্যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এসব বিস্ফোরক দাবি উত্থাপন করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, নির্বাচনে কারচুপির স্বপক্ষে ‘রাজসাক্ষী’ বা সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে দ্রুত জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়। তাদের মতে, সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে দেওয়া রিজওয়ানা হাসানের সাক্ষাৎকারটি গভীর ইঙ্গিতপূর্ণ এবং সেখানে তিনি পরোক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিকে দমানোর চেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন।

ডা. তাহের তার বক্তব্যে ‘লন্ডন ষড়যন্ত্র’ নামক এক চাঞ্চল্যকর তত্ত্ব সামনে আনেন। তিনি দাবি করেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা। নির্বাচনকে একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধার পুরস্কারস্বরূপ তাকে পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে। এই কারচুপির মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে একটি কৃত্রিম ফলাফল তৈরি করা হয়েছে।
ড. খলিলুর রহমানের অবিলম্বে অপসারণ দাবি করেন এবং বলেন, যারা এই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের প্রত্যেককে আইনের মুখোমুখি করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত নেতা নির্বাচনের পেছনের কুশলীবকদের আধুনিক যুগের ‘মীরজাফর’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘এই মীরজাফররা দেশের কোটি কোটি মানুষের সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। পুরো সরকার নাকি সরকারের একটি বিশেষ অংশ এই ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নেড়েছে তা আজ দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন উপদেষ্টা কীভাবে একটি নির্দিষ্ট আদর্শের শক্তিকে ‘মেইনস্ট্রিম’ হতে না দেওয়ার দম্ভোক্তি করেন? এটি কি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ছিল, নাকি কোনো আন্তর্জাতিক বা বিশেষ মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন ছিল?

সম্প্রতি একটি জাতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উগ্রবাদ ও রাজনীতিতে নারীর অবস্থান নিয়ে কথা বলেন।

সেখানে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম না নিলেও বলেন, ‘তাদের রাজনীতির যে অংশ নারীবাদ ও নারীর সমান অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে সে অংশ নিয়ে আমাদের কাজ করা উচিত। তারা যেন কখনও মূলধারায় (Mainstream) আসতে না পারে, আমরা সেই কাজটি করতে পেরেছি।’

জামায়াতে ইসলামীর দাবি, এই বক্তব্যের মাধ্যমে রিজওয়ানা হাসান স্বীকার করে নিয়েছেন যে তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে বা কোণঠাসা করতে কাজ করেছেন। এটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির সরাসরি পরিপন্থী।

ভোটের পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও জামায়াত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ডা. তাহের অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর দেশে শান্তি ফেরার পরিবর্তে অস্থিরতা বেড়েছে।

জামায়াতের দাবি, বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের এই কঠোর অবস্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রিজওয়ানা হাসান ও ড. খলিলুর রহমানের মতো ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে দেওয়া এই বক্তব্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর এই সংবাদ সম্মেলন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের দ্বার উন্মোচন করল। ‘মীরজাফর’ এবং ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ শব্দগুলোর ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে, সামনের দিনগুলোতে রাজপথে ও আইনি লড়াইয়ে এই ইস্যুটি আরও জোরালো হবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার বা অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী প্রতিক্রিয়া দেখান।

Leave A Reply

Exit mobile version