Friday, July 24, 2026

বাবার কবরের মাটি তখনও শুকায়নি। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারানোর শোক বুকে নিয়েই রাতে কর্মস্থলে ছুটতে হয়েছিল ইসমাইল ইকনকে। কারণ, পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে। অথচ পরদিনই ছিল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। জীবনের এমন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া সেই তরুণের সংগ্রামের গল্প এবার পৌঁছে গেছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
বাগেরহাটের এই শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম ড. এহছানুল হক মিলন। তিনি ইকনের পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষাকালীন সময়ে যাতে তাকে আর জীবিকার জন্য চাকরি করতে না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন।
বুধবার রাতে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী ফারহান ইশতিয়াক ফোন করে ইকনকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে ইকনের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। পাশাপাশি এইচএসসি পরীক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষাসহ তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের সার্বিক দায়িত্বও নেবে সরকার।
ইকনের জীবনসংগ্রামের খবর সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অসংখ্য মানুষ তার সাহস, দায়িত্ববোধ ও অদম্য মানসিকতার প্রশংসা করেন। অনেকেই তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। সেই মানবিক আবেদনেই সাড়া দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান ইকনের বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে মুহূর্তেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে পরিবারটি। মা ও মানসিক ভারসাম্যহীন এক ভাইকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করা ইকনের সামনে তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—সংসার চলবে কীভাবে?
কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি। বাবার দাফন শেষ করেই সেদিন রাতে কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে নিজের দায়িত্ব পালন করতে যান ইকন। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই বই খুলে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। পরদিন সকালে চোখে অশ্রু আর বুকভরা শোক নিয়েই তিনি অংশ নেন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়।
ইকনের এই গল্প কেবল একজন শিক্ষার্থীর সংগ্রামের নয়; এটি দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ এবং স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলার এক অনন্য উদাহরণ। আর সেই স্বপ্ন যাতে দারিদ্র্যের কাছে হার না মানে, সে লক্ষ্যেই এবার তার পাশে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র।
শিক্ষামন্ত্রীর এই উদ্যোগে স্বস্তি ফিরেছে ইকনের পরিবারে। অন্তত পরীক্ষার সময় তাকে আর জীবিকার জন্য রাত জেগে কাজ করতে হবে না। এখন তার একমাত্র দায়িত্ব—মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া এবং নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া।

Exit mobile version