গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে আবারও জোরালো হয়েছে পদত্যাগের আলোচনা। দীর্ঘদিন ধরেই তার পদত্যাগ বা অপসারণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন থাকলেও এবার তা বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
বঙ্গভবনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্মানজনকভাবে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চান। সূত্রটির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এবং সেই কারণেই পদত্যাগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা আগের মতো নেই। তিনি ওপেন হার্ট সার্জারি করিয়েছেন এবং সব সময়ই সম্মানজনকভাবে দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সরকারও বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির ওপেন হার্ট সার্জারি হয়। পরে যুক্তরাজ্যে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তার হৃদযন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লক ধরা পড়ে। এরপর জরুরিভিত্তিতে সফলভাবে এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর।
এদিকে বিএনপি ও সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বিষয়ে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে ইতোমধ্যে বার্তা দেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই মন্তব্য করেনি।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও তিনি সাংবিধানিক এই পদে বহাল থাকা একমাত্র শীর্ষ ব্যক্তি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংসদ না থাকায় প্রয়োজনীয় আইন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করা হয়েছিল।
পদত্যাগ বিতর্কের সূত্রপাত
রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে বিতর্কের সূচনা হয় ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের পর। সেখানে তিনি বলেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়। যদিও সে সময় বিএনপি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিরোধিতা করে জানায়, এতে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর পর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গে তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।
সংবিধান কী বলছে?
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে এ দায়িত্বে রয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলটির ভূমিকাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কে হতে পারেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি?
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যেই সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন এবং নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নাম বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি ছাড়াও দলের জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচনায় রয়েছে।
তবে সম্ভাব্য নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকার বা বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনা অব্যাহত রয়েছে।

