রবিবার, মার্চ ১, ২০২৬
১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরান বর্তমানে তার ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় পার করছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তেহরান থেকে কুর্দিস্তান পর্যন্ত। কিন্তু এই প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করতে ইরান সরকার যে পথ বেছে নিয়েছে, তাকে আধুনিক যুগের এক ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট ও সামরিক দমন-পীড়ন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পেগাহ বানিহাশেমির মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে এমন এক ভয়ংকর ফাঁদে আটকা পড়েছেন, যা থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ আর খোলা নেই।

গত ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে ইরান বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কেবল ইন্টারনেট নয়, ল্যান্ডফোন ও মুঠোফোন সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। এই অন্ধকার সময়ের মধ্যে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাইরে আসা অল্প কিছু ভিডিও ও ছবি শিউরে ওঠার মতো। সেখানে দেখা যাচ্ছে, রাস্তায় বেসামরিক মানুষের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে এবং সামরিক কায়দায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, এই কয়েক দিনে প্রায় ১২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে খামেনি যে দুটি ভাষণ দিয়েছেন, তাতে তার চিরাচরিত অনড় ও কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন ঘটেছে। ১৯৯৯, ২০০৯ বা ২০২২ সালের আন্দোলনের মতো এবারও তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই বিক্ষোভের নেপথ্য কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। বিক্ষোভকারীদের তিনি দাঙ্গাবাজ ও বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় বিভ্রান্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির এই ভাষণের মূল লক্ষ্য জনতা নয়, বরং তার অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীকে এ বার্তা দেওয়া যে, নেতা এখনো হাল ছাড়েননি।

খামেনি গত কয়েক দশকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে তুলেছেন। তিনি বাহিনী থেকে অবিশ্বস্তদের সরিয়ে কেবল চূড়ান্ত অনুগতদের স্থান দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারকেও আলাদা আবাসন এলাকায় রেখে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়। এই নিরাপত্তা বেষ্টনীই মূলত খামেনির ক্ষমতার প্রধান খুঁটি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপরও তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, ফলে দেশের ভেতরের খবরের বয়ান কেবল তার পক্ষেই থাকে।

২০১৯ সালের নভেম্বরের আন্দোলনের পর থেকে ইরান সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করাকে একটি মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এবারের ব্ল্যাকআউট ইতিহাসের দীর্ঘতম। এর উদ্দেশ্য দুটি, প্রথমত, বিশ্বের কাছে দমন-পীড়নের খবর পৌঁছাতে বাধা দেওয়া; দ্বিতীয়ত, আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমন্বয় ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তবে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কারণে সব তথ্য চাপা রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

খামেনি পদ্ধতিগতভাবে ইরানের স্বাধীন রাজনৈতিক ও নাগরিক শক্তিকে পঙ্গু করে দিয়েছেন। নাসরিন সুতুদেহ বা নার্গেস মোহাম্মদির মতো মানবাধিকার কর্মীদের বারবার কারারুদ্ধ করা হয়েছে। আটক বিক্ষোভকারীদের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো কোনো আইনজীবী নেই, এমনকি আহতদের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকদের বাধা দেওয়া হচ্ছে।

নিহতদের লাশ ফেরত পেতে পরিবারকে বুলেটের দাম দিতে হচ্ছে, এমন অমানবিক অভিযোগও উঠে এসেছে। এই পদ্ধতিগত নিপীড়ন দেশটিকে এক বড় ধরনের মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এবারের বিক্ষোভের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ইরানিদের মানসিকতার পরিবর্তন। গত বছর ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও অনেক সরকারবিরোধী ইরানি দেশপ্রেমের টানে রাষ্ট্রের পাশে ছিলেন। কিন্তু এবারের নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ গণহত্যার পর সেই নাজুক দেশপ্রেম ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেছে।

আগে মানুষ বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী থাকলেও, এখন ১২ হাজার মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে অনেক ইরানি মনে করছেন, বাইরের কোনো লক্ষ্যভিত্তিক হামলা হয়তো অভ্যন্তরীণ এ স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে কম ক্ষতিকর হবে। মানুষ এখন আর রাষ্ট্রের রক্ষাকবচ হতে আগ্রহী নয়। খামেনি এমন এক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যা কেবল দমনের মাধ্যমেই টিকে থাকে। এই দমন-পীড়ন তাকে সাময়িক বিজয় দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তাকে এক ভয়ংকর ফাঁদে ফেলেছে।

একদিকে তার নিজের দেশের জনগণ এখন তার বিরুদ্ধে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সাথে যদি বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তিনি এমন এক সমাজ পাবেন যা আর রাষ্ট্রের জন্য প্রাণ দিতে ইচ্ছুক নয়।

খামেনি এখন দুই আগুনের মাঝখানে, ভেতরে জনগণের সাথে অবিরাম যুদ্ধ অথবা বাইরে থেকে আসা সামরিক আঘাতের মোকাবিলা। এই সংকটকাল তার গত চার দশকের শাসনের সবচেয়ে ভঙ্গুর ও দুর্বল দিকটিকে উন্মোচিত করে দিয়েছে।

Leave A Reply

Exit mobile version