গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে চলমান টানাপড়েনের মধ্যে এক চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত ডেনমার্কের কাছ থেকে আর্কটিক অঞ্চলের এই বিশাল দ্বীপটি কিনেই নেয়, তবে এর দাম হতে পারে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার। এই হিসাব করতে গিয়ে তিনি আলাস্কা ক্রয়ের ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনেছেন। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের মানুষের প্রতি ডেনমার্কের ঐতিহাসিক আচরণকে ‘ঔপনিবেশিক’ ও ‘নিষ্ঠুর’ বলে কড়া সমালোচনা করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
বুধবার রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে পুতিন গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৮৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার কাছ থেকে মাত্র ৭২ লাখ ডলারে আলাস্কা কিনেছিল। সেই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সেওয়ার্ডের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল, যাকে বলা হতো ‘সেওয়ার্ডস ফলি’ বা সেওয়ার্ডের বোকামি। কিন্তু কালক্রমে সেই আলাস্কাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অমূল্য হয়ে ওঠে।
পুতিন বলেন, আলাস্কার আয়তন ও সেই সময়ের মূল্যের সঙ্গে তুলনা করলে গ্রিনল্যান্ডের বর্তমান দাম হওয়া উচিত ২০ কোটি থেকে ২৫ কোটি ডলার। তবে বর্তমান স্বর্ণের বাজারমূল্য এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করলে এটি বড়জোর ১০০ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে।
এ সময় মৃদু হেসে তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র এই অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।
পুতিন আরও উল্লেখ করেন যে, ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ডেনমার্কের কাছ থেকে ‘ড্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ’ (বর্তমানে ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডস) ২৫ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের স্বর্ণের বিনিময়ে কিনেছিল ওয়াশিংটন।
কেবল ভূ-রাজনীতি নয়, ডেনমার্কের দীর্ঘদিনের শাসন নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন পুতিন। তিনি অভিযোগ করেন, ডেনমার্ক সবসময় গ্রিনল্যান্ডের মানুষের সঙ্গে ঔপনিবেশিক আচরণ করেছে। তার দাবি, কোপেনহেগেন এই দ্বীপবাসীর প্রতি অত্যন্ত কঠোর এবং ক্ষেত্রবিশেষে ‘নিষ্ঠুর’ আচরণ করেছে।
উল্লেখ্য, ১৮শ শতাব্দী থেকে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের উপনিবেশ ছিল। ১৯৫৩ সালে ডেনমার্কের সংবিধানে একে একটি আনুষ্ঠানিক অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তখন স্থানীয়দের কোনও মতামত নেওয়া হয়নি। ২০০৯ সাল থেকে দ্বীপটি স্বায়ত্তশাসন পেলেও এখনও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির জন্য ডেনমার্কের ওপর নির্ভরশীল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন। ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকার সংক্ষিপ্ততম রুটটি গ্রিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে যাওয়ায় এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালিস্টিক মিসাইল আর্লি-ওয়ার্নিং সিস্টেমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র এটি না কিনলে রাশিয়া বা চীন সেখানে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।
যদিও রাশিয়া এই আশঙ্কাকে ‘হিস্টেরিয়া’ বা অহেতুক আতঙ্ক বলে উড়িয়ে দিয়েছে। পুতিন সাফ জানিয়েছেন, এই দ্বন্দ্বে রাশিয়ার কোনও স্বার্থ নেই। তিনি বলেন, এটি ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বিষয়। তারাই এটি মিটিয়ে নেবে।
ডেনমার্ক সরকার এই দ্বীপ বিক্রির প্রস্তাব শুরু থেকেই নাকচ করে আসছে। গ্রিনল্যান্ডের নেতারাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের দ্বীপটি কোনও বিক্রি যোগ্য পণ্য নয়। প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের এই দ্বীপটি খনিজ সম্পদ, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ হলেও এর অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত। গ্রিনল্যান্ডের ১৭টি শহরের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এখনও কোনো সড়কপথ নেই।

