মরুভূমির দেশ কুয়েত, যা তার ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির জন্য পরিচিত, সেখানে বর্তমানে এক বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি কুয়েতের বিচার মন্ত্রণালয় এবং কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটিতে বিয়ের হার যেমন বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনাও।
সরকারি তথ্যমতে, কুয়েতে গড়ে প্রতি ৩৪ মিনিটে একটি নতুন দাম্পত্য জীবন শুরু হচ্ছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রতি ৭৫ মিনিটে একটি করে সংসার ভেঙে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যে সমাজ ব্যবস্থায় বিবাহবিচ্ছেদকে একটি সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখা হতো, সেই কুয়েতেই আজ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৯টি বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে। এ পরিসংখ্যানটি শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি কুয়েতি সমাজের গভীরে চলমান এক কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরিসংখ্যানের গভীর বিশ্লেষণ কুয়েতের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গত এক বছরে বিয়ের মোট সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বৃদ্ধির হার ইতিবাচক মনে হলেও, বিবাহবিচ্ছেদের হার ১০ শতাংশ এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
তথ্য অনুযায়ী বিয়ের হার দিনে গড়ে ৪২টি বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে। বিচ্ছেদের হার দিনে গড়ে ১৯টি বিচ্ছেদ ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ সময় অধিকাংশ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে বিয়ের প্রথম ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে।
কেন বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ? সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ সামাজিক বিশ্লেষক এবং মনোবিজ্ঞানীরা কুয়েতে এ উচ্চ বিচ্ছেদ হারের পেছনে বেশ কিছু মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন।
১. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নারীর ক্ষমতায়ন: কুয়েতি নারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাবলম্বী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নারীরা আর আগের মতো অসুখী বা অসম্মানজনক দাম্পত্য জীবন বয়ে বেড়াতে আগ্রহী নন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ায় বিচ্ছেদের পর জীবনযাপনের অনিশ্চয়তা তাদের এখন আর সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিচ্ছে না।
২. দ্রুত জীবনযাত্রা ও ধৈর্যের অভাব: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতার অভাব দেখা যাচ্ছে। ছোটখাটো পারিবারিক কলহ বা মতের অমিল হলেই তারা সমঝোতার পরিবর্তে বিচ্ছেদকেই সমাধান হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
৩. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব: সোশ্যাল মিডিয়া কুয়েতিদের ব্যক্তিগত জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে। অন্যদের পারফেক্ট জীবন দেখে নিজের জীবনের সাথে তুলনা করা এবং ভার্চুয়াল জগতের মোহ অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক অশান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
৪. পারিবারিক হস্তক্ষেপের অভাব: পুরোনো দিনে বড় বড় যৌথ পরিবারগুলো বিবাদ মীমাংসায় ভূমিকা রাখত। বর্তমানে কুয়েতে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বড়দের পরামর্শ বা মধ্যস্থতার সুযোগ কমে গেছে।
সরকারের উদ্বেগ ও গৃহিত পদক্ষেপ কুয়েত সরকার এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু কঠোর এবং সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিচার মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, এখন থেকে যেকোনো বিচ্ছেদের আবেদন সরাসরি আদালতে যাওয়ার আগে একটি পারিবারিক পরামর্শ কেন্দ্র, ফ্যামিলি কাউন্সিলিং সেন্টার, এর মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এ কেন্দ্রের কাজ হবে দম্পতিদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা, ক্ষোভের কারণগুলো চিহ্নিত করে পেশাদার থেরাপিস্ট দিয়ে কাউন্সিলিং করা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাদের পুনরায় একত্রিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। সরকারি তথ্য মতে, এ বাধ্যতামূলক কাউন্সিলিং পদ্ধতির কারণে প্রায় ২০ শতাংশ দম্পতি তাদের বিচ্ছেদের আবেদন প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।
স্থানীয় শিল্প ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিয়ের হার বাড়ার ফলে কুয়েতের স্থানীয় অর্থনীতিতে, বিশেষ করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, জুয়েলারি এবং ক্যাটারিং ব্যবসায় এক ধরনের চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো বিবাহবিচ্ছেদের ফলে আবাসন সংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ওপর চাপ বাড়ছে। কুয়েতি আইনে ডিভোর্সি নারী এবং সন্তানদের জন্য সরকার থেকে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা থাকায় রাষ্ট্রীয় বাজেটেও এর একটি প্রভাব পড়ছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও উপসংহার কুয়েতের এ পরিসংখ্যান আরব্য অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য একটি সতর্কতা সংকেত। সৌদি আরব বা কাতার, সবখানেই আধুনিকায়ন এবং ঐতিহ্যের লড়াইয়ে পারিবারিক কাঠামো বদলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র আইন দিয়ে বিচ্ছেদ কমানো সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।
কুয়েতের এ ৩৪ বনাম ৭৫ মিনিটের লড়াই আসলে আধুনিক বিশ্বের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পারিবারিক স্থিতিশীলতার মধ্যকার সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। আগামী কয়েক বছর কুয়েত সরকার এবং সমাজ এ সংকট কীভাবে মোকাবিলা করে, তার ওপর নির্ভর করবে দেশটির ভবিষ্যৎ সামাজিক ভারসাম্য।

