সোমবার, জুন ১, ২০২৬
১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে হরমুজ প্রণালিতে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখন শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, মানবিক সংকটের দিক থেকেও এক গভীর উদ্বেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শত শত জাহাজ আটকে পড়ায় হাজার হাজার নাবিক দীর্ঘদিন ধরে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন ইন্টারট্যাঙ্কোর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১০৫টি তেলবাহী ও পণ্যবাহী জাহাজে প্রায় ২ হাজার ৪০০ নাবিক আট সপ্তাহ ধরে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, পুরো পারস্য উপসাগরজুড়ে প্রায় ২ হাজার জাহাজে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই সংকটে আটকা পড়েছেন।

আটকে থাকা নাবিকদের একজন, ভারতীয় অধিনায়ক রাহুল দাহার জানান, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে তার জাহাজ দীর্ঘদিন ধরে স্থির হয়ে আছে। সামনে-পেছনে অসংখ্য জাহাজের সারি থাকায় কোনোভাবেই এগোনো সম্ভব হচ্ছে না।

নাবিকদের বর্ণনায় উঠে এসেছে খাদ্য ও পানির ক্রমবর্ধমান সংকটের চিত্র। অনেক জাহাজেই এখন টিনজাত খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আর নিরাপদ পানির মজুত দ্রুত কমে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকি-ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে তাদের।
সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরানের বিভিন্ন বন্দরে বহু জাহাজ আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এক নাবিক জানান, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকেই তারা উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু কবে বা কীভাবে তারা মুক্ত হবেন, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। আকাশে যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের টহল তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এদিকে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে ইরানের নতুন শর্ত। কিছু জাহাজকে পারাপারের অনুমতি পেতে হলে প্রতি জাহাজে ২০ লাখ ডলার পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। এতে জাহাজ মালিক ও নাবিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

দীর্ঘদিন আটকে থাকার ফলে নাবিকদের পারিশ্রমিক নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। নির্ধারিত সময়ের বাইরে অবস্থান করলেও তারা বেতন পাবেন কিনা, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

একজন নাবিকের কথায়, তাদের একমাত্র চাওয়া নিরাপদে বাড়ি ফেরা। এই সংঘাতের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও বাস্তবে তারা যেন বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আটকে থাকা নাবিকদের সরিয়ে নিতে অন্তত তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave A Reply

Exit mobile version