Friday, July 17, 2026

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা মামলার রায় আগামীকাল রবিবার (৭ জুন) ঘোষণা করা হবে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য করেন।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত এবং মামলার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আদালতের কাছে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানান।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের বিশেষ আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ আদালতে বলেন, ঘটনার সময় প্রধান আসামি নেশাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি তার জন্য মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন করেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আসামি সোহেল রানা ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের নাম উল্লেখ করেননি। স্বপ্না ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না; তবে লাশ গুমের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় শাস্তি দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
এর আগে গত ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি শেষে আদালত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ৪ জুন দিন ধার্য করেছিলেন।
গত ২ জুন মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। সাক্ষীরা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং বিভিন্ন আলামত উপস্থাপন করেন। এসব সাক্ষ্যে রামিসাকে খোঁজার ঘটনা, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট শনাক্তকরণ, রক্তের আলামত উদ্ধার এবং শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে অভিযোগ অনুযায়ী স্বপ্না আক্তার কীভাবে সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন, সে বিষয়েও বক্তব্য দেওয়া হয়।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় আদালত আসামি সোহেল রানার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমিও দোষ করছি, ডলারও দোষ করছে স্যার। আমাকেও সাজা দেন, সঙ্গে ওকেও দেন। ওকে কেউ দেখে নাই, ওরে ধরেন স্যার।”
তিনি আরও বলেন, “আমার একটা ছোট সন্তান আছে। আমি ক্ষমা চাচ্ছি স্যার, আমাকে মাফ করে দেন। আরেকটা কথা, আমার স্ত্রী কোনো দোষ করেনি, সে নির্দোষ।”
এ সময় বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনার বিষয়ে আপনি বলুন।”
পরে আদালত স্বপ্না আক্তারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রথমে নীরব থাকেন। আদালত তাকে উদ্দেশ করে বলেন, দরজা না খোলার বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিতে চান কি না। একই সঙ্গে বিচারক সতর্ক করে বলেন, স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারও একই ধরনের শাস্তি হতে পারে। জবাবে স্বপ্না বলেন, “আমি কিছু করিনি স্যার, আমি নির্দোষ।”
মামলায় বাদী ও ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার সাক্ষ্যের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া ভিকটিমের মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুপু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, প্রতিবেশীসহ মোট ১৬ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী পুলিশ সদস্য, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী ম্যাজিস্ট্রেট এবং তদন্ত কর্মকর্তাও।
মামলার সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজের কক্ষে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তার মা। একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়া না পেয়ে তারা অন্য বাসিন্দাদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতরে তার মাথা দেখতে পান তারা।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় ২০ মে ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

Exit mobile version