Friday, July 17, 2026

টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মনু ও ধলাই নদীর একাধিক স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে জেলার চার উপজেলায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে মৌলভীবাজার সদর, রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার প্রায় ১০ হাজার পরিবারের অন্তত ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বন্যার পানিতে নিম্নাঞ্চল এখনো তলিয়ে রয়েছে। টানা বৃষ্টি ও ঢলের কারণে আমনের বীজতলা, আউশ ধানের ক্ষেত, শীতকালীন সবজি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার ও গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, শনিবার (১১ জুলাই) বিকেল ৫টায় মনু নদীর চাঁদনীঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। একই সময়ে মনু নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৩০ সেন্টিমিটার, ধলাই নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে ২৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার এবং জুড়ী নদীতে ২৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এক হাজার ৭৫০ ব্যাগ শুকনো ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বড়লেখায় ২৬০ ব্যাগ, জুড়ীতে ১৫৭, কুলাউড়ায় ৩৪০, রাজনগরে ২১০, মৌলভীবাজার সদরে ৩১৩, শ্রীমঙ্গলে ২৩৫ এবং কমলগঞ্জে ২৩৫ ব্যাগ বিতরণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উজানে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমায় মনু ও ধলাই নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজনগর উপজেলা। মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুরসহ সদর এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে আরও প্রায় ২৫টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার পৌরসভা ও চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের রাজাপুর ও শিকড়া গ্রামের বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শিকড়া, আলিনগর, ধামুলিসহ কয়েকটি গ্রাম পানিতে ডুবে যায়। এসব এলাকায় পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও নতুন করে হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওরের পানি বাড়ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, পানিবন্দি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ শুরু হয়েছে। দুর্গতদের আশ্রয়ের জন্য জেলার ১৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষকে সেখানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বিপুল সিকদার বলেন, টেংরা, কামারচাকসহ কয়েকটি ইউনিয়নের হাজারো মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের অংশগুলো মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রাখা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার জন্য জেলার সব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

Exit mobile version