বিশ্বকাপ সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল উন্মাদনা ক্রমেই বাড়ছে। তবে এই উৎসবের আবহের মধ্যেই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা জটিলতা বিশ্বকাপকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাবেক ও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জারি করা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফুটবলপ্রেমী সমর্থকদের একটি বড় অংশ ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ—যাদের মধ্যে সেনেগাল, মরক্কো, ইরান ও হাইতির মতো দেশ রয়েছে—তাদের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ প্রক্রিয়া আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। যদিও খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, ফেডারেশন কর্মকর্তা এবং খেলোয়াড়দের নিকটাত্মীয়দের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে, সাধারণ সমর্থকদের জন্য সে সুযোগ প্রযোজ্য নয়।
নতুন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি
চলতি বছরের জুন মাসে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন একটি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করে, যার আওতায় ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর বিভিন্ন মাত্রার প্রবেশ সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। ওই তালিকায় ইরান ও হাইতির নাম উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে আসে। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের “জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য অপরিহার্য” বলে ব্যাখ্যা করেন।
এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বকাপে অংশ নিতে আসা খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভিসা পেলেও সাধারণ দর্শকদের ক্ষেত্রে সেই পথ অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে করে বিশ্বকাপের ‘সর্বজনীন উৎসব’ চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ফিফা পাস: আশার আলো, নাকি সীমিত সুবিধা?
বিশ্বকাপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সমর্থকদের উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত করতে গত নভেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন ‘ফিফা পাস’ (FIFA PASS) চালুর ঘোষণা দেয়। এই পাস মূলত একটি প্রাধান্যপ্রাপ্ত ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা, যা বিশ্বকাপের টিকিটধারী দর্শকদের জন্য নির্ধারিত।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফিফা পাস নিজে কোনো ভিসা নয়। এটি শুধুমাত্র ভিসা আবেদনের জন্য দ্রুত সাক্ষাৎকারের সুযোগ করে দেয়। আবেদনকারীদের এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত কঠোর নিরাপত্তা যাচাই ও স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি, যেসব দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে, তারা কেবল বিশ্বকাপের টিকিট কিনলেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
ফলে ফুটবলপ্রেমী বহু সমর্থকের কাছে ফিফা পাস আশার পরিবর্তে অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউইয়র্কে প্রবাসী সেনেগালিদের জমায়েত
এই প্রেক্ষাপটে রোববার নিউইয়র্ক সিটির সেনেগালি প্রবাসী কমিউনিটির সদস্যরা শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক একটি আদালত ভবনে একত্রিত হন। ১১৯ বছর পুরোনো এই ভবনটি নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই আয়োজনের নেতৃত্ব দেন মামদানি—যিনি নিউইয়র্ক সিটির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। অনুষ্ঠানটি শুধু ফুটবল ঘিরে নয়, বরং প্রবাসী আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি ও শহরের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তুলে ধরার একটি মঞ্চে পরিণত হয়।
মামদানি যা বললেন
দ্য অ্যাথলেটিক-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মামদানি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই খেলাটির প্রতি ভালোবাসা, এই দেশগুলোর প্রতি আবেগ—সবকিছুই নিউইয়র্কবাসী মূলত নিজের ঘরের ভেতর কিংবা নির্দিষ্ট কিছু পাড়ায় সীমাবদ্ধ রেখেছে। এটি কখনোই পুরো শহরের স্বীকৃতি পায়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘এই আয়োজন আমাদের সেনেগালি কমিউনিটি, মরক্কান কমিউনিটি এবং বৃহত্তর আফ্রিকান কমিউনিটির শক্তি ও সৌন্দর্য তুলে ধরার সুযোগ। একই সঙ্গে এটি বলার একটি উপায় যে নিউইয়র্ক সত্যিই ‘বিশ্বের শহর’ এবং ফুটবল ‘বিশ্বের খেলা’।
মামদানি মনে করেন, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক ও নাগরিক স্থানগুলোকে ফুটবল উদযাপনের কেন্দ্রে পরিণত করা হলে শহরের বৈচিত্র্য ও বিশ্বজনীন চরিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
বিশ্বকাপ নিউইয়র্কে, কিন্তু সমর্থকরা কি আসতে পারবেন?
২০২৬ বিশ্বকাপে মোট আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচও। যদিও স্টেডিয়ামটি নিউ জার্সিতে, তবে ফিফার হোস্ট সিটি চুক্তি নিউইয়র্ক সিটি ও নিউ জার্সি—উভয়ের সঙ্গেই করা হয়েছে। এই কারণে মামদানি বিশ্বকাপসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—নিউইয়র্কে প্রবাসী সেনেগালিরা যখন আদালত ভবনে ড্রাম বাজিয়ে, গান গেয়ে বিশ্বকাপের উত্তেজনা ছড়াচ্ছেন, তখন তাদের নিজ দেশের বহু মানুষ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতিই পাবেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিশ্বকাপের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু খেলোয়াড়দের টুর্নামেন্ট নয়; এটি সমর্থকদের উৎসব, সংস্কৃতির মিলনমেলা এবং বিশ্বজনীন সংহতির প্রতীক।
বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ ও প্রশ্নবোধক অন্তর্ভুক্তি
ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নীতিমালা বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ইভেন্টের ক্ষেত্রে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—কে অংশ নিতে পারবে, আর কে বঞ্চিত হবে? খেলোয়াড়রা মাঠে নামলেও যদি তাদের দেশের সমর্থকরা গ্যালারিতে থাকতে না পারেন, তবে বিশ্বকাপের সার্বজনীন আবেদন কতটা বজায় থাকবে—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের পাঁচ মাস আগে দাঁড়িয়ে নিউইয়র্কে উদযাপন ও উদ্বেগ—দুই-ই পাশাপাশি চলছে। এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও ফিফা কীভাবে এই ভিসা ও ভ্রমণ সংকটের সমাধান করে, এবং সত্যিকার অর্থে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ‘বিশ্বের খেলা, বিশ্বের মানুষের জন্য’ রূপ দিতে পারে কি না।
