বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক সময়ের বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ‘নয়-ছয়’ সুদের হারে আর কখনোই ফিরে যাবে না দেশের অর্থনীতি। কৃত্রিমভাবে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সুদহার নয়, বরং বাজারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ঋণের মূল্য। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই নীতিগত ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও ব্যাংকিং খাতের প্রভাব: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন।
বিগত সরকারগুলোর সময় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ এবং আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, যা অর্থনীতিতে ‘নয়-ছয়’ ফর্মুলা হিসেবে পরিচিত। গভর্নরের মতে, এই চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করেছে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশের অর্থনীতি আর সেই অকার্যকর নয়-ছয়ের যুগে ফিরে যাবে না। বর্তমানে সুদের হার কিছুটা বেশি মনে হতে পারে, তবে এটি সময়ের প্রয়োজন। বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থাপনাই টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ। তিনি আরও যোগ করেন যে, এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ ঘটুক বা না ঘটুক, আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে হলে আমাদের সুদের হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতেই হবে।
গভর্নর স্পষ্ট করেন যে, সুদের হার স্থিতিশীল করতে হলে প্রধান শর্ত হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সুদের হার কমানো সম্ভব নয়। আর এর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় কমানো।আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি কমিয়ে রিজার্ভকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
গভর্নরের বক্তব্যে উঠে আসে যে, বৈদেশিক মুদ্রার দামের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল এলডিসি উত্তরণের শর্ত নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ।
একই অনুষ্ঠানে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী একে আজাদ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, অথচ সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
একে আজাদ সতর্ক করে বলেন, শুধুমাত্র কঠোর মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে বা সুদের হার বাড়িয়ে আর্থিক খাতকে পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ না বাড়লে বেকারত্ব আরও বাড়বে।
সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকের তারল্য সংকট ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে গভর্নর জানান, ব্যাংক খাতে টাকার বড় ধরণের ঘাটতি রয়েছে। একসঙ্গে সব ব্যাংক ঠিক করা জাদুর মতো সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা করছি ধাপে ধাপে সংস্কার করার। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আর্থিক শৃঙ্খলার স্বার্থে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত থাকবে।
২০২৬ সালের শুরুতে গভর্নরের এই বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আর কোনো রাজনৈতিক প্রেশার গ্রুপ বা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলবে না। এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে।
গভর্নরের এমন ইঙ্গিতের পরপরই ব্যবসায়ী মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিদের মতে, সুদের হার যদি ১৪-১৫ শতাংশের ঘরে চলে যায়, তবে নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ অনেক শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। সেই সময় যদি উৎপাদন খরচ (Cost of Doing Business) সুদের হারের কারণে বেড়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা চ্যালেঞ্জিং হবে।
একে আজাদের বক্তব্যের রেশ ধরে ব্যবসায়ীরা দাবি তুলেছেন, কেবলমাত্র ঋণের সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর তত্ত্ব সবসময় কাজ করে না। কারণ, এতে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে বাজারমূল্য আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ‘সিলেক্টিভ ক্রেডিট পলিসি’ বা নির্দিষ্ট উৎপাদনশীল খাতের জন্য বিশেষায়িত সুদের হারের দাবি জানিয়েছেন।
গভর্নরের এই ‘কঠোর’ অবস্থানের পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণের শর্তাবলি একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। আইএমএফ বারবার বাজারভিত্তিক সুদের হার (Market-based interest rate) এবং খেলাপি ঋণ কমানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। গভর্নর আজ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার না করা পর্যন্ত আমানতকারীদের আস্থার সংকট কাটবে না। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা বা লিকুইডেশনে নেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্য অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ‘নয়-ছয়’ পদ্ধতিটি ছিল মূলত একটি ‘আর্থিক দমন নীতি’ (Financial Repression), যা দীর্ঘ সময় ধরে আমানতকারীদের লোকসান করিয়ে ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা দিয়েছে। গভর্নরের নতুন অবস্থান এই বৈষম্য দূর করতে সহায়ক হবে।
গভর্নর তার বক্তব্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিষয়টিকেও উন্নয়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, সুদের হার বাজারভিত্তিক হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আশ্বস্ত হবে। বর্তমানে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি ব্যবহার করে ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বাজারভিত্তিক সুদের হার কার্যকর হলে ডলারের বিপরীতে টাকার মানে যে বড় ধরণের অস্থিরতা ছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ড. আহসান এইচ মনসুর তার বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত এই বার্তাই দিয়েছেন যে, ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে হলে সাময়িক কষ্ট মেনে নিতে হবে। কৃত্রিম ওষুধের বদলে এখন তিতা বড়ি সেবন করেই অর্থনীতির অসুখ সারাতে হবে। তবে এই সংস্কারের ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) যাতে পিষ্ট না হয়, সেদিকে নজর রাখা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

