সোমবার, মার্চ ২, ২০২৬
১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। এই আবহে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলার পাড়ে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় কড়া বার্তা দিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে কেউ যদি ‘অন্ধকার গলিপথ’ বা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন, তবে তার পরিণাম শুভ হবে না।

রবিবার দুপুরে ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনের নির্বাচনী কমিটি আয়োজিত এই জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভোটাধিকার এবং আগামী দিনের রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন।

বক্তব্যের শুরুতেই জামায়াত আমির একটি গুঞ্জনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি, কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়ে বাঁকা ও অন্ধকার গলিপথে হাঁটার চেষ্টা করছেন।’ তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো দল বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করলেও তার এই ইঙ্গিত যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি, তা স্পষ্ট।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এখনো জীবন্ত। যারা ষড়যন্ত্রের কথা ভাবছেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে জুলাইয়ের যোদ্ধারা ঘুমিয়ে পড়েনি। তারা একটি লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং দ্বিতীয় কোনো ষড়যন্ত্র রুখতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।

বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটাধিকার হরণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার কড়া সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা আগে বলত আমার ভোট আমি দেব, তোমারটাও আমি দেব। সেই অন্ধকার দিন এখন শেষ।’
তরুণ ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জুলাইয়ের বিপ্লবে যারা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের ভোটকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে দেশে ‘আগুন জ্বলবে’। ভোটারদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক করেন এবং ইনশাআল্লাহ এবার ‘যার ভোট সে দেবে’ এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই সাথে সংসদ নির্বাচন ও যে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাকে দেশের স্বাধীনতার দ্বিতীয় পর্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সব শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে ভোট দিতে হবে। তার ভাষায়, ‘এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা মানে হলো আজাদি বা মুক্তি, আর ‘না’ বলা মানে হলো গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ থাকা।

তিনি আরও বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা অস্ত্র দিয়ে আর কখনো জনগণের ওপর গুলি চালানো হবে না এমন একটি বাংলাদেশ তারা গড়তে চান।

দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা চাঁদাবাজির বিষয়েও কথা বলেন শফিকুর রহমান। তিনি এই অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের সুপথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বা প্রভাব সৃষ্টি করলে এদের হালাল রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করা হবে। তবে যারা এই পথ ছাড়বেন না, তাদের ‘লাল কার্ড’ দেখিয়ে সমাজ থেকে বিতাড়িত করার ঘোষণা দেন তিনি।

মাদ্রাসা শিক্ষা ও ধর্মীয় ইস্যুগুলোতেও জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। বিগত সরকারগুলো কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার প্রতি বিমাতা সুলভ আচরণ করেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘কওমি সনদের স্বীকৃতি কেবল উচ্চস্তরে দেওয়া হয়েছে, যা একটি অপূর্ণাঙ্গ পদক্ষেপ। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদ্রাসাগুলোর পরিচালকদের সাথে বসে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ও সম্মানজনক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করবে।

এছাড়া, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরসহ বিভিন্ন সময়ে হেফাজত ও ধর্মীয় আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জনসভা শেষে ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-৪ আসনের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং ঢাকা-৫ আসনের প্রার্থী কামাল হোসেনের হাতে দলের প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ তুলে দেন। তিনি স্থানীয় এলাকাবাসীকে এই দুই প্রার্থীকে জয়যুক্ত করার মাধ্যমে দেশে ন্যায়বিচার কায়েমের আহ্বান জানান।

জনসভায় জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মী ছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং এবি পার্টির নেতারা সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন। সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির আবদুস সবুর ফকির।

Leave A Reply

Exit mobile version