রবিবার, মার্চ ১, ২০২৬
১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশিশক্তি, পুরুষতান্ত্রিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির পুরোনো ধারা অব্যাহত থাকা এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অপরিণামদর্শী পদক্ষেপের ফলে গণভোট নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, শুরুতে নির্বাচনে সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তই বজায় রেখেছেন।

রবিবার ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘প্রাক-নির্বাচন এবং গণভোট পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। প্রতিবেদনটির একাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. মাহফুজুল হক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনি সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার কারণে সার্বিকভাবে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আগের মতো এবারও রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশিশক্তির ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন; বরং অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার আগের তুলনায় আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রচারণা চলতে থাকলেও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, জুলাই সনদে পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীরা উপেক্ষিত হয়েছেন। তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কর্মী ও প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার কারণে কমিশনের ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারী প্রায় ১৪ হাজার গণমাধ্যমকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য কিছু সময়ের জন্য ফাঁস হয়ে যায়, যা গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে।

টিআইবি জানায়, অনুমোদিত সময়ের আগেই রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেন এবং দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২–এর ধারা ৩ ও ৪ ভঙ্গ করে দেয়াল, খুঁটি, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনায় পোস্টার ও প্রচারণা সামগ্রী লাগান। অর্থাৎ সব প্রার্থীই কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন।

প্রচার কার্যক্রমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও তুলে ধরে টিআইবি জানায়, ইতোমধ্যে ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্রার্থী নির্ধারিত নির্বাচনি ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছেন। ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা অতিক্রমের গড় হার দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ৩১০ টাকা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ভোটারদের প্রভাবিত করতে নগদ অর্থ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নির্বাচনি প্রচারণাসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রচারে একটি রাজনৈতিক দলের আধিপত্য ছিল, যা মোট সময়ের প্রায় ৬৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিপরীতে, গণভোটসংক্রান্ত প্রচারণায় মাত্র ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ সময় ব্যয় করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে একটি আসনে দুই দলের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে তফসিল ঘোষণার আগে সংঘর্ষের হার ছিল ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশে। রাজশাহী বিভাগে এই হার ছিল যথাক্রমে ২২ দশমিক ২ ও ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ঢাকা বিভাগে ২২ দশমিক ৩ ও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। সর্বোচ্চ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে এবং সর্বনিম্ন সিলেট বিভাগে।

গণভোট প্রসঙ্গে টিআইবি জানায়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকারের দোদুল্যমানতা এবং উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট রাখার উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ প্রণয়ন গণভোট নিয়ে শুরু থেকেই ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয় হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

সরকারি প্রচারণা শুরুর ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণা বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নির্দেশনা কতটা সুচিন্তিত, আইনসম্মত ও গঠনমূলক—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলছে, প্রজ্ঞাপন জারির আগে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে আলোচনা হলে অযাচিত বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব হতো।

সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ প্রার্থীর নির্বাচনি প্রচারণার ব্যয় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে এবং প্রচারণায় ধর্মীয় বিষয়বস্তুর অপব্যবহার জোরালোভাবে দৃশ্যমান, যা দেশের মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সমান অধিকারের ধারণা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু, ভিন্ন জাতিগত ও লিঙ্গ পরিচয়ের ভোটার এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার পরিবেশও ঝুঁকিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনলাইন ও অফলাইন—নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরেই আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন ঘটলেও নির্বাচন কমিশন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। মেটা বা গুগলের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয় না থাকায় বিতর্কিত কনটেন্ট সরানো হচ্ছে না, যেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত রয়েছে।

নির্বাচনকালীন সব অংশীজনের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীতে মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও এর ভুক্তভোগী। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচনকে নির্বাচন হিসেবে মেনে নেওয়া এবং জনগণের রায় গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী নির্বিশেষে সব ভোটার যেন ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানপ্রদত্ত ম্যান্ডেট অনুযায়ী জুলাই সনদের ওপর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট অর্জনের দায়িত্ব সরকারের। তবে তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও কমিশনের সম্মতি ছাড়া নির্দেশনা দিয়ে সরকার কমিশনের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ করেছে। এতে নির্বাচন কমিশনও আইনের ভুল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অপ্রয়োজনীয় ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে।

গণভোটের মূল ভিত্তি রক্তাক্ষরে রচিত জুলাই সনদের অধিকাংশ প্রস্তাব—বিশেষ করে সুশাসন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সকল মানুষের সমঅধিকারের অঙ্গীকার—টিআইবির দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে টিআইবির অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

Leave A Reply

Exit mobile version