Friday, July 17, 2026

টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। গত ৫ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে এবং পাহাড়ধসের ঘটনায় জেলায় মোট ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সবশেষ শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের ১২ বছর বয়সী মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা মারা যায়। একই ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে স্থানীয় বাসিন্দা সোলতান আহমদের দুই বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিমের মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে চকরিয়া থেকে বিভক্ত নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় পানির স্রোতে ভেসে প্রাণ হারায় আরিফুল ইসলামের তিন বছর বয়সী ছেলে পুষ্পর। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ধসে একটি বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। কক্সবাজার সদর, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ২৬ জন রয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলা। এছাড়া কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে রয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং অনেক এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার, যিনি মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন, বলেন, চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গতদের জন্য ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন।
তিনি আরও জানান, দুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষও চালু করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, শুক্রবার রাত পর্যন্ত গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

Exit mobile version