রবিবার, মার্চ ১, ২০২৬
১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। নিহত মোতালেব ডিএডি (ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর) পদমর্যাদায় র‍্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন।

এ ঘটনায় আরও কয়েকজন র‍্যাব সদস্য আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
পাশাপাশি ঘটনাস্থলে র‍্যাবের তিন সদস্যকে সন্ত্রাসীরা জিম্মি করে রেখেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সিরাজুল ইসলাম র‍্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সোমবার বিকেলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

র‍্যাব সূত্র জানায়, সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম র‍্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে যায়। অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা র‍্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক র‍্যাব কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় দুর্বৃত্তরা র‍্যাবের তিন সদস্যকে জিম্মি করে রাখে বলে জানানো হয়।

সীতাকুণ্ড থানার সেকেন্ড অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) জাফর আহমদ ভূঁইয়া বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে রয়েছি। ওসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয়রা জানান, এলাকাটি সশস্ত্র পাহারার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ। জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, লিংক রোডসংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাসজমির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।

এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। সর্বশেষ সেখানে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন নিহত হন। পরদিন ওই এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

এর আগেও একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান ও পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও র‍্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম খবর পেয়ে যায়। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ফলে এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উল্লেখ্য, জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জমি উদ্ধার না হওয়ায় এসব প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন হয়নি

Leave A Reply

Exit mobile version