বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দেশের ডিজিটাল বিপ্লবকে আরও ত্বরান্বিত করতে এবং সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে উন্নত প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আকাশচুম্বী দামের কারণে যারা পছন্দের স্মার্টফোনটি কিনতে দ্বিধায় ছিলেন, তাদের জন্য মুঠোফোন আমদানিতে ২৫ শতাংশ হার শুল্ক কমিয়ে মাত্র ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আমদানিকৃত ফোনের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ৬০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক এক ধাক্কায় ৬০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে আমদানিকৃত বিদেশি ফোনের পাশাপাশি দেশে তৈরি বা সংযোজিত ফোনের দামও উল্লেখযোগ্য হারে কমতে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি ফেরার পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।শুল্ক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন

এনবিআরের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগে একটি পূর্ণাঙ্গ মুঠোফোন আমদানিতে ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হতো। নতুন সিদ্ধান্তে তা কমিয়ে মাত্র ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আমদানিকৃত ফোনের ওপর বিদ্যমান শুল্ক এক লহমায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে, দেশীয় মুঠোফোন সংযোজনকারী শিল্প যাতে অসম প্রতিযোগিতার মুখে না পড়ে, সেদিকেও নজর দিয়েছে সরকার। স্থানীয় কারখানায় ফোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বা উপকরণ আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে দেশীয় শিল্পের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক কমল ৫০ শতাংশ।

গ্রাহকের পকেট থেকে কত টাকা কমবে?
শুল্ক কমার এই সুবিধা সরাসরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছাবে। এনবিআরের প্রাথমিক হিসাব এবং বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে:

আমদানিকৃত ফোনের ক্ষেত্রে: ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের একটি বিদেশি স্মার্টফোনের দাম আগের চেয়ে প্রায় ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। আইফোন, স্যামসাং বা পিক্সেলের মতো উচ্চমূল্যের ফোনগুলোর ক্ষেত্রে এই দাম কমার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

দেশে সংযোজিত ফোনের ক্ষেত্রে: ৩০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের দেশে তৈরি ফোনের দাম আনুমানিক ১,৫০০ টাকা কমবে। মিড-রেঞ্জ বা বাজেট ফোনের ক্ষেত্রেও এই দাম কমার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কেন এই সিদ্ধান্ত? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্মার্টফোন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষা, ব্যবসা এবং সরকারি সেবা গ্রহণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। শুল্ক কমানোর ফলে:

১. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার সহজ হবে।
২. ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের বিকাশ ঘটবে।
৩. অবৈধ পথে বা গ্রে-মার্কেটে ফোন আসা বন্ধ হবে এবং বৈধ পথে আমদানি বাড়বে।

দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা ও ভারসাম্য

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেছে। কেবল আমদানিতে শুল্ক কমালে দেশীয় ফোন কারখানাগুলো ক্ষতির মুখে পড়ত। কিন্তু উপকরণ আমদানিতেও ৫ শতাংশ শুল্ক ছাড় দেওয়ায় দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো (যেমন- ওয়ালটন, সিম্ফনি) বাজারে টিকে থাকার এবং প্রতিযোগিতা করার সমান সুযোগ পাবে। এতে করে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ফোনের বাজারও চাঙ্গা থাকবে।

বাজার পরিস্থিতির ওপর প্রভাবগত এক বছরে ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের মোবাইল বাজারে ফোনের দাম প্রায় ১৫-২০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। অনেক সাধারণ ক্রেতা স্মার্টফোন ছেড়ে ফিচার ফোনের দিকে ঝুঁকছিলেন। নতুন এই শুল্ক ছাড়ের ফলে বাজারে চাহিদা আবার বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BMPIA) এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, শুল্ক কমলে হ্যান্ডসেট চোরাচালান কমে যাবে, ফলে সরকার বৈধ আমদানির মাধ্যমে আরও বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এই শুল্ক হ্রাস একটি মাইলফলক। এখন নজর থাকবে খুচরা বাজারের দিকে। আমদানিকারক ও পরিবেশকরা সরকারের এই সুবিধার সুফল কত দ্রুত সাধারণ ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ৩০ হাজার টাকার ফোনে ৫,৫০০ টাকার ছাড় মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের জন্য নিঃসন্দেহে ২০২৬ সালের সেরা উপহার।

Leave A Reply

Exit mobile version