দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আলোচনা ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেল ৪টার দিকে তিনি ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। ব্যক্তিগত কারণেই তিনি দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগকে কেন্দ্র করে বিকেল ৫টায় জরুরি সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংসদ সচিবালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ-সংক্রান্ত বিষয়েই এই ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে
মো. সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ইসলামী ব্যাংকের একটি শীর্ষ পদে কর্মরত অবস্থায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন পান। ওই পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিতর্ক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল তার অপসারণের দাবি তোলে। তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয় এবং বঙ্গভবনের সামনেও আন্দোলন হয়।
তবে সাংবিধানিক জটিলতার কথা উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের পথে যায়নি। সে সময় বিএনপিও এ দাবির পক্ষে অবস্থান নেয়নি। ফলে বিষয়টি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক গুরুত্ব হারায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হলেও জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর ৮ আগস্ট তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। যদিও সে সময়ও তার পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি চলমান ছিল।
সীমিত হয়ে পড়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম ও রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন জারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিতি ছিল সীমিত। এমনকি জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতেও তিনি অংশ নিতে পারেননি।
এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশনার পর বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ ঘটনায় নিজের অপমানবোধের কথা প্রকাশ করেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, দায়িত্ব ছেড়ে যেতে তিনি আগ্রহী। দূতাবাস ও কনস্যুলেট থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলার ঘটনায় জনগণের মধ্যে ভুল বার্তা গেছে বলেও মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, এতে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে রাষ্ট্রপতিকেও হয়তো সরিয়ে দেওয়া হতে পারে, যা তাকে গভীরভাবে অপমানিত করেছিল।
নতুন করে শুরু হয় আলোচনা
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের পর রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নামও আলোচনায় উঠে আসে।
তবে মার্চ মাসে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছিলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ তখনও উল্লেখযোগ্য সময় বাকি থাকায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
অবশেষে চার মাসের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন মো. সাহাবুদ্দিন। এখন তার পদত্যাগের পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

