বাংলাদেশের রাজনীতির ক্রান্তিকালে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজার মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি বড় ধরনের আস্থার বার্তা দিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি সাফ জানিয়েছেন, বর্তমান কমিশন এখন পর্যন্ত অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গেই তাদের দায়িত্ব পালন করছে এবং বিএনপি বিশ্বাস করে এ কমিশন একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হবে।
সোমবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা ও বিএনপির অবস্থান প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচন কমিশনের বাছাই প্রক্রিয়ায় কিছু সমস্যা থাকা নতুন কোনো ব্যাপার নয়। এগুলো প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ঘটে থাকে। তবে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, বর্তমান কমিশন মোটামুটিভাবে যোগ্যতার সঙ্গেই এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে যেসব ত্রুটি বা উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে, কমিশন তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা যে সমস্যাগুলো মনে করেছি, তা সরাসরি সিইসির সামনে তুলে ধরেছি। আমরা বিশ্বাস করি, ইসি এসব ছোটখাটো ত্রুটি সংশোধন করে যোগ্যতার সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে।
মাঠপর্যায়ে সব দলের জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে অন্যান্য দলগুলোর, যেমন কমা জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এর পক্ষ থেকে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন বিএনপি মহাসচিব।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, মাঠপর্যায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুলের এ বক্তব্য নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় স্বস্তি হিসেবে কাজ করবে। কারণ, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা কমিশনের কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
আজ ১৯ জানুয়ারি আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে পরিচিত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে সকাল থেকেই নেতা-কর্মীদের ঢল নামে জিয়া উদ্যানে। পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন এবং যুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভিত্তি তিনি স্থাপন করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, তলাবিহীন ঝুড়ি অভিহিত হওয়া বাংলাদেশকে তিনি একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত করেছিলেন। আজ আমরা তার মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছি, শহীদ জিয়ার আদর্শ বাস্তবায়ন এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লড়াইয়ে আমরা রাজপথে অটল থাকব।
শ্রদ্ধা নিবেদনের এ কর্মসূচিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, দলের শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা। স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা আব্বাস সহ অঙ্গ সংগঠনের কয়েক হাজার নেতা কর্মী মিছিলে মিছিলে এলাকা মুখরিত করে তোলেন। জিয়া উদ্যান থেকে শুরু করে বিজয় সরণি পর্যন্ত এলাকায় নেতা কর্মীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
মির্জা ফখরুলের আজকের এ বক্তব্যকে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একদিকে যেমন তিনি নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে দলীয় নেতা কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে জিয়ার আদর্শের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক শপথের কথা বলেছেন। এনসিপির মতো জোট শরিকরা যখন কমিশন ঘেরাও বা নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিচ্ছে, তখন বিএনপির এ ইতিবাচক অবস্থান রাজনৈতিক ময়দানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
১৯ জানুয়ারি তারিখটি বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে থাকবে। কারণ, এদিন বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে কমিশনের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের আভাস মিলেছে। এখন দেখার বিষয়, মির্জা ফখরুলের এ আস্থার প্রতিদান ইসি কতটুকু দিতে পারে এবং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়।

