আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশের এক উচ্চাভিলাষী ও কঠোর কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার জাতীয় সংসদে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের মামলাকে সরকার ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের লুণ্ঠিত সম্পদ ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জানান যে, বিগত সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অর্থ পাচার সংঘটিত হয়েছে, তার প্রকৃত চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরতে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারের মূল অঙ্গীকার ছিল আর্থিক খাতের জঞ্জাল পরিষ্কার করা। এই শ্বেতপত্রের মাধ্যমে কেবল পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ নয়, বরং এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদেরও নাম প্রকাশ করা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য ১১টি অগ্রাধিকারভুক্ত মামলার তালিকা পেশ করেন। এই তালিকায় রয়েছে দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী, যারা বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলো হলো:
১. শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবার:সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তাঁর পরিবার এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।
২. সাইফুজ্জামান চৌধুরী:সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
৩. এস আলম গ্রুপ:এই শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ।
৪. বেক্সিমকো গ্রুপ:ঋণের নামে অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।
৫. সিকদার গ্রুপ:বিদেশে অবৈধ সম্পদ গড়ার সুনির্দিষ্ট মামলা।
6. বসুন্ধরা গ্রুপ:জমি ও আবাসন খাতের আড়ালে অর্থ পাচারের অনুসন্ধান।
৭. নাসা গ্রুপ ও ওরিয়ন গ্রুপ:ব্যবসায়িক আড়ালে আর্থিক অপরাধের অভিযোগ।
৮. নাবিল গ্রুপ ও সামিট গ্রুপ:বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতের সুবিধাভোগী হিসেবে অর্থ স্থানান্তরের তদন্ত।
৯. এইচ বি এম ইকবাল ও পরিবার:আর্থিক ‘খাতের প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ পাচারের মামলা।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স এই মামলাগুলোর মাধ্যমে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা কেবল অভ্যন্তরীণ আইনি লড়াই নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানান যে, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়না।
এরমধ্যে ‘মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের‘সঙ্গে সম্পদ ফেরানোর বিষয়ে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রাথমিক সম্মতি পাওয়া গেছে। বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াটি বর্তমানে সরকারের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রাখছি যাতে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাচারের ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ‘২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার‘পাচার হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকারও বেশি। প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। আমরা প্রতিটি ডলার শনাক্ত করতে এবং তা ফেরত আনতে বদ্ধপরিকর।
দুর্নীতি দমনের পাশাপাশি দেশের তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়েও সংসদে সুসংবাদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে সরকার এক হাজার বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ফ্রিল্যান্সার তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
এরই মধ্যে সাড়ে সাত হাজার ফ্রিল্যান্সারকে পরিচয়পত্র বা ‘ফ্রিল্যান্সার কার্ড’ দেওয়া হয়েছে এবং আগামীতে এই সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তরুণরা যাতে ঘরে বসে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে, সে জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো ও আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি নাম ঘোষণা এবং সুনির্দিষ্ট ১১টি মামলার কথা উল্লেখ করা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন। এর আগে কখনোই কোনো সরকারপ্রধান সরাসরি এত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা সংসদে পেশ করেননি। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুইজারল্যান্ড বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো থেকে সম্পদ ফিরিয়ে আনা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এর জন্য প্রয়োজন জোরালো তথ্য-প্রমাণ এবং নিরবচ্ছিন্ন আইনি তদারকি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আজকের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, সরকার সেই জটিল পথে হাঁটতে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ভাষণ কেবল রাজনৈতিক হুঙ্কার নয়, বরং লুণ্ঠিত সম্পদ পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকারপত্র। পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিটি পয়সা ফেরত আনার যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলার মাধ্যমে যদি এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া সফল হয়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর্থিক সুশাসনের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করেন, তবে সংসদ কক্ষ জুড়ে তখনো আলোচনার কেন্দ্রে ছিল প্রধানমন্ত্রীর সেই দুঃসাহসী ঘোষণা।

