২০২৫ সালে উচ্চ আদালত সহ নি¤œ আদালতে নানান ঘটনা ঘটে। এ সময়ে উচ্চ আদালতে রাজনৈতক নেতাদের মামলা থেকে খালাস দেয়া হয়েছে। আবার অনেককে দন্ডও প্রদান করা হয়েছে। সে কারনে পুরো বছরই ছিল আদালতের কর্মকান্ড। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন যখন উত্তপ্ত, সেই উত্তাপের প্রতিফলন ঘটে আদালতেও। নির্বাচন ব্যবস্থা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন, সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ নেতাদের বিচার সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে বিচার বিভাগ ছিল জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিদায়ী বছর বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ও ঘটনাবহুল বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একের পর এক চাঞ্চল্যকর রায়, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, বিচারক নিয়োগ অপসারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক মামলার নিষ্পত্তিতে মানুষের দৃষ্টি ছিল আদালতের দিকে। রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, নিম্ন আদালতের বিচারক থেকে শুরু করে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের পদচারণায় উচ্চ আদালত ছিল সরগরম।
বিদায়ী বছরে সরকার ২২ জন অতিরিক্ত বিচারপতিকে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে নারী বিচারপতিও রয়েছেন, যা বিচার বিভাগে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিএনপি নেতা নিতাই রায় চৌধুরীর ছেলে বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বাদ পড়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনাও হয়।
২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত রায়গুলোর একটি হলো নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল। আপিল বিভাগ ১৪ বছর আগে দেওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়কে অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ ঘোষণা করে তা বাতিল করেন। একই সঙ্গে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা হয়। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ রায়ে বলেন, অতীতের রায়টি ছিল ‘কলঙ্কিত’ এবং একাধিক ত্রুটিতে ভরা। এই রায়ের ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক পথ উন্মুক্ত হয়।
২০২৫ সালে দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। ২৪ ডিসেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তার নিয়োগের তথ্য জানানো হয়। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন, যা শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে কার্যকর হয়।
১৯৬১ সালের ১৮ মে জন্মগ্রহণ করা জুবায়ের রহমান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যে আন্তর্জার্তিক আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে তার বিচারিক জীবন শুরু হয়। ২০২৪ সালে তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। তার নেতৃত্বে বিচার বিভাগ সংস্কার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও দৃঢ় হবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আইন অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা।
বিদায়ী বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক ঐতিহাসিক রায় ও আদেশ আসে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। একই মামলায় রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাজা কমিয়ে পাঁচ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। এছাড়া র্যাবের টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এই মামলাগুলো দেশের মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদন্ড থেকে খালাস দেন আপিল বিভাগ। সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় দেন। আইনজ্ঞদের মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদন্ড থেকে খালাস পাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিরল।
দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছর পর বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ পাঁচজনকে খালাস দেন হাইকোর্ট। এর মাধ্যমে বাবরের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা নিষ্পত্তি হয় এবং তার মুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা থাকে না। ১৪ বছর ধরে চলমান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার ছেলে তারেক রহমানসহ সব আসামিকে খালাস দেন আপিল বিভাগ। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, মামলার বিচার প্রক্রিয়া ছিল বিদ্বেষপূর্ণ এবং হয়রানিমূলক। এই রায়ের ফলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আর কোনো দন্ডাদেশ বহাল রইল না।
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে দলটির নিবন্ধন ও প্রতীক সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয় নির্বাচন কমিশনকে। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ এটির উদ্বোধন করেন। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতিদের আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কয়েকজন বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। ১২ জন বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়, যাদের মধ্যে কেউ কেউ পদত্যাগ করেন, কেউ অপসারিত হন এবং কয়েকজনের বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।
২০২৫ সাল প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কেবল বিচার নিষ্পত্তির জায়গা নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম কেন্দ্র। রায় ও আদেশের মাধ্যমে আদালত বারবার জানিয়েছে, সংবিধানই সর্বোচ্চ এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। বিদায়ী বছরের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, সামনের দিনগুলোতেও মানুষের দৃষ্টি থাকবে আদালতের দিকেই কারণ এখানেই নির্ধারিত হচ্ছে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক অধিকারের ভবিষ্যৎ।

