ইরানে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে এবং গত ১১ দিনে অন্তত ৩৪ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতেও দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, বর্তমানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১১১টি শহর ও নগরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ৪ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থলগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও টিয়ার গ্যাসের জবাবে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। বিপ্লবী গার্ডের ঘনিষ্ঠ আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরদেগান শহরে সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিতে হাদি আজারসালিম ও মুসলেম মাহদাভিনাসাব নামে দুইজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
তেহরান, কাজভিন, বন্দর আব্বাস এবং পবিত্র শহর মাশহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরাচারীর মৃত্যু হোক’ এবং ধর্মীয় নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে ‘মোল্লারা বিদায় নাও’ স্লোগান দিচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত পাহলভি রাজবংশের পক্ষেও স্লোগান শোনা গেছে।
এবারের অস্থিরতার মূলে রয়েছে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন এবং প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছানো মুদ্রাস্ফীতি। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ব্যবসায়ীরা উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে প্রথম রাস্তায় নামেন, যা দ্রুত সাধারণ মানুষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সরকারি অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণে দেশটির অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতিমধ্যে ৭১ মিলিয়ন নাগরিককে মাসিক সাত ডলার সমপরিমাণ বিশেষ ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দিলেও তা জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারছে না।
ইরানের অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক চাপ ও হুঁশিয়ারি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই হুমকির কারণেই ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী হয়তো বড় ধরনের সামরিক দমন-পীড়ন চালাতে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। তবে বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি এজেই ‘দাঙ্গাকারীদের’ দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পর এটিই ইরানে বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় এবং চ্যালেঞ্জিং জনবিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

