ফুটবল ইতিহাসে “সর্বকালের সেরা” (GOAT) নিয়ে বিতর্ক বহু পুরোনো। পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—প্রত্যেকেই নিজ নিজ যুগের কিংবদন্তি। তবে গত দুই দশকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, অসংখ্য রেকর্ড, ব্যক্তিগত ও দলীয় সাফল্য এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয় জয় করে লিওনেল মেসি নিজেকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে নয়, অনেকের মতে সর্বকালের সেরা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আর্জেন্টিনার রোজারিও শহর থেকে উঠে আসা এই ফুটবল জাদুকর ছোটবেলায় গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় ভুগলেও সেই বাধাকে জয় করে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফুটবলারদের একজন হয়ে ওঠেন। বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়ায় বেড়ে ওঠা মেসি ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং একের পর এক শিরোপা জয় করেন।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকে মেসির ঝুলিতে রয়েছে রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি’অর, একাধিক দ্য বেস্ট ফিফা মেনস প্লেয়ার পুরস্কার এবং ৬টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট। এছাড়া লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা, বার্সেলোনার সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বাধিক ৯১ গোল করার মতো অসংখ্য বিশ্বরেকর্ডও তার দখলে।
জাতীয় দলের হয়েও মেসির অর্জন ঈর্ষণীয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তিনি আর্জেন্টিনাকে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এবং ফিনালিসিমার শিরোপা জেতান। বিশ্বকাপে তার নেতৃত্ব, গোল ও অ্যাসিস্ট তাকে ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সে মেসি দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। যদিও ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজিত হয়ে শিরোপা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি, তবুও পুরো টুর্নামেন্টে তার নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং প্রভাব ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
পরিসংখ্যানের বাইরে মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি তার খেলার সৌন্দর্য। ক্ষিপ্র ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস, অসাধারণ ভিশন, ফ্রি-কিক, গোল করার ক্ষমতা এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর দক্ষতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হয়েও তিনি গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টেও বহু রেকর্ড গড়েছেন।
তবে “বিশ্বসেরা” উপাধি নিয়ে বিতর্ক এখনও রয়েছে। অনেকেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পেলে কিংবা ম্যারাডোনাকে সর্বকালের সেরা মনে করেন। ফুটবলের ভিন্ন যুগ, ভিন্ন পরিবেশ এবং ভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে এ বিতর্কের নির্দিষ্ট সমাধান নেই। কিন্তু অর্জন, ধারাবাহিকতা এবং খেলার নান্দনিকতার বিচারে লিওনেল মেসিকে সর্বকালের সেরা মনে করেন বিশ্বের অসংখ্য ফুটবল বিশ্লেষক, সাবেক খেলোয়াড় ও সমর্থক।
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, আবার বিদায়ও নিয়েছেন। কিন্তু লিওনেল মেসির নাম এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। মাঠের জাদুকর হিসেবে নয়, অধ্যবসায়, বিনয় ও নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবেও তিনি বিশ্ব ফুটবলে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন।

