অর্থের অভাবে একসময় যাদের কাছে আদালতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব, রাষ্ট্রের বিনামূল্যের আইনগত সহায়তা কার্যক্রম বা লিগ্যাল এইডের কল্যাণে এখন তারাও ন্যায়বিচার পাচ্ছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা, অজ্ঞতা কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা—কোনো কিছুই আর বিচারপ্রাপ্তির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। ফলে দেশের হাজারো দরিদ্র, অসহায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী মানুষ আইনের আশ্রয় নিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ আদালতে মামলা পরিচালনা, আইনজীবী নিয়োগ কিংবা আইনি পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েও অর্থের অভাবে আইনের দ্বারস্থ হতে পারেননি। লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সেই বাস্তবতায় পরিবর্তন এনে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করেছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (এনএলএএসও) দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। এর আওতায় দেওয়ানি, ফৌজদারি, পারিবারিক বিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ভরণপোষণ, শ্রম বিরোধসহ বিভিন্ন ধরনের মামলায় বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অসচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য আইনজীবী নিয়োগ, মামলার ব্যয় বহন এবং প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম শ্রমিক আইনি সহায়তা সেলের মাধ্যমে শ্রমিকদের ৪ হাজার ৬৪০টি মামলায় সরকারি খরচে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮২০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।
এছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতির আওতায় শ্রমিকদের ৩ হাজার ৩০৯টি মামলায় উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার মধ্যে ১ হাজার ৯২০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এ সময় ৩০ হাজার ১০২ জন শ্রমিক সরকারি খরচে আইনি সহায়তা পেয়েছেন। শুধু আইনি সহায়তাই নয়, শ্রমিকদের অনুকূলে ৬ কোটি ৯৭ লাখ ১১ হাজার ৯১৬ টাকা ক্ষতিপূরণও আদায় করে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আদালতকেন্দ্রিক সেবার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক বিরোধ মামলা ছাড়াই দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে সময় ও অর্থ—উভয়ের সাশ্রয় হচ্ছে। পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের পাওনা আদায়, চাকরিচ্যুতি, ক্ষতিপূরণ এবং শ্রম অধিকার সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত সমাধানেও এ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ, মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমজীবী মানুষ, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তি এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় হেল্পলাইন নম্বর ১৬৪৩০-এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই লিগ্যাল এইড সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে লিগ্যাল এইড কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কারণ বিচার কেবল বিত্তবানদের জন্য নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। একজন দরিদ্র ব্যক্তি যদি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সমাজে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে। আগে যেখানে অনেক মানুষ মামলা করতে ভয় পেতেন কিংবা অর্থাভাবে আইনি লড়াই থেকে সরে দাঁড়াতেন, সেখানে এখন তারা রাষ্ট্রের সহায়তায় নিজেদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি আদালতের ওপর মামলার চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, লিগ্যাল এইড সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবার পরিধি বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিচারপ্রাপ্তি আরও সহজ হবে। বিশেষ করে শ্রমিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আইনি সচেতনতা বাড়ানো সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু আদালতের দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে লিগ্যাল এইড কার্যক্রম হয়ে উঠেছে একটি কার্যকর ও মানবিক উদ্যোগ। একসময় যাদের কাছে আদালতের পথ ছিল দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল, আজ তাদের অনেকেই রাষ্ট্রের সহায়তায় ন্যায়বিচার পাচ্ছেন। লিগ্যাল এইড কার্যক্রম যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—ন্যায়বিচার কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়, এটি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

