কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ দাশ মূল পরিকল্পনাকারী। আর পুলিশের সাবেক পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নিজের হাতে থাকা সরকারি পিস্তল দিয়ে সিনহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরপর চারটি গুলি করেন এবং এই গুলির আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। আলোচিত এ হত্যা মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন বিষয়টি উঠে এসেছে।
গত ২ জুন প্রদীপ-লিয়াকতের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মঞ্জুর ও আসামিদের আপিল খারিজ করে এ রায় দেয় বিচারপতি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি সগির হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ।
রবিবার ৩৭৮ পৃষ্টার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। যাতে সিনহা হত্যা মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও সাক্ষীদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এ মামলায় হাইকোর্টের রায়ে ছয় জনের যাবজ্জীবন বহাল থাকে। তারা হলেন, বাহারছড়া পুলিশ তদন্দ কেন্দ্রের বরখাস্ত উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাগর দেব, রুবেল শর্মা, পুলিশের সোর্স ও বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।
‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে ২০২০ সালে প্রায় এক মাস কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকার একটি রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন সিনহা ও তার দুজন সহযোগী দুই শিক্ষার্থী। ওই বছরের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে গুলিতে নিহত হন সিনহা। ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত এক রায়ে প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। পাশাপাশি ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ও পুলিশের অন্য সাতজনকে খালাস দেয়। পরে বিচারিক আদালতের রায়ের নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
সাক্ষীদের বক্তব্য ও সিনহার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন উল্লেখ করে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রদীপ কুমার দাশ এ হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড, পরিকল্পনাকারী ও ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সে ভিকটিম মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের বুকের বাম পাঁজরে জুতা পরা পা দিয়ে জোরে আঘাত করে। তার বুকের দুটি হাড় ভাঙাসহ ভিকটিমের গলার বাম পাশে জুতা পরা পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।’
হাইকোর্ট বলেন, ‘এটি প্রমাণিত হয়েছে যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামি লিয়াকত আলী পূর্বপরিকল্পনামতে ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তার হাতে থাকা সরকারি পিস্তল দিয়ে নিরস্ত্র মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার শরীরের ঊর্ধ্বাংশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরপর চারটি গুলি করেছেন। গুলির আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে।’
হাইকোর্টের রায়ে ছয়জনের যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখার যুক্তিতে বলা হয়, ‘আলোচ্য হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সাধারণ অভিপ্রায়ের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিচারিক আদালত তাদের অপরাধের ধরন বিচার-বিশ্লেষণ করে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় উল্লিখিত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন, যা সঠিক ও যুক্তিযুক্ত বলে আমরা মনে করি।’

