দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আবারও কমতির দিকে। চলতি বছরের অক্টোবর শেষে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশে, যা দুই মাস আগেও ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। তবে প্রবৃদ্ধি কমলেও কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিক আমানতের পরিমাণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণও কমছে। মূলত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সুদের হার বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ মন্দার কারণে আমানত বাড়ছে। তবে যেসব ব্যাংক দুর্বল ভিত্তির, তারা নতুন আমানত টানতে পারছে না, উল্টো আমানত হারাচ্ছে। এতে সার্বিক আমানতে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই বছর ধরে তীব্র মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের বাস্তব সঞ্চয় ক্ষমতা কমে গেছে। মানুষের হাতে আগে যেমন অতিরিক্ত টাকা থাকত, এখন তা নেই। আবার আস্থা সংকটও পুরোপুরি কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মনে করেন আমানত প্রবৃদ্ধি টেকসইভাবে বাড়াতে হলে মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা জরুরি। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসের পরিবেশ যত শক্ত হবে, আমানত তত বাড়বে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমলে সাধারণ গ্রাহকের সঞ্চয় করার সক্ষমতা বাড়বে। তখন আমানতে জোরালো প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে।
আমানত বাড়লেও প্রবৃদ্ধি ফের নিম্নমুখী : গত অর্থবছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সেটি অক্টোবর শেষে বেড়ে হয়েছে ১৯ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে গত চার মাসে আমানত বেড়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অক্টোবর মাসেই বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত বছরের অক্টোবরে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে গত এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর গত আগস্টে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ০২ শতাংশ। এর আগে দুই অঙ্কের ঘরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ওই মাসে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তা আরও নিম্নমুখী হয়ে পড়েছিল। কারণ ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং নতুন সরকার গঠনের পর একের পর এক ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠনের কারণে গত অর্থবছরের জুলাই থেকে আগস্ট এই দুই মাসে ব্যাংকগুলোতে আমানত কমেছিল প্রায় ১০ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা।
হাতের নগদ টাকা ব্যাংকে ফিরছে : বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা সংকট বিরাজ করছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা সামনে আসায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি আস্থার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ফলে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখার প্রবণতা দেখা দেয়। তবে সুদের হার বৃদ্ধিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংস্কারমূলক নানা পদক্ষেপে আস্থা সংকট কাটতে শুরু করায় কয়েক মাস ধরে ঘরের টাকা ব্যাংকে ফিরছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের জুন শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। সেটি কমে চলতি অর্থবছরের অক্টোবর শেষে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। ফলে চার মাসে নগদ অর্থ ব্যাংকে ফেরার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে
অক্টোবর মাসে ফিরেছে ৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এর আগে গত মে ও জুন মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ বেড়েছিল প্রায় ১৯ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কোরবানির ঈদের কারণে মে মাসে ১৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা ও জুন মাসে ২ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা বাড়ে। এ ছাড়া রোজার ঈদের কারণে গত মার্চ মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়েছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এপ্রিলে মাসে আবার ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ কমেছিল প্রায় ১৯ হাজার ৬৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোতে তারল্য চাপ ও বাড়তি প্রতিযোগিতা : আমানত প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় কিছু ব্যাংকের তারল্য চাপ দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমানত বাড়াতে নতুন নানা অফার দিচ্ছে। কেউ বাড়তি সুদ দিচ্ছে, কেউ বিশেষ ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। তবে ব্যাংকাররা বলছেন, প্রতিযোগিতা বাড়লেও সার্বিক আমানত বৃদ্ধির পরিবেশ এখনও অনুকূল নয়। বাজারে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে অফার-ইনসেনটিভ দিয়েও আমানত সংগ্রহ করা কঠিন।
সুত্র: জিয়াদুল ইসলাম

