দেশের উচ্চ আদালত সহ নিম্ন আদালতে পাহাড় সম মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থা এক দিনে বা এক বছরে হয় নি। বহুবছরের পঞ্জীভুত সমস্যা বর্ধিত হয়ে বর্তমানে এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে পৌছেছে। শহর সম্প্রৃসারনের ফলে সরকার কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ ,জমির মৃুল্য বৃদ্ধি , জেলা হতে অসংখ্য লোকের ঢাকায় আগমনের ফলে বাসস্থানের চরম অভাব ,অগ্রক্রয় বৃদ্ধি সামন্য জমি যার জন্য আগে আদৌ কোন চিন্তা না থাকলেও জমির মুল্য বৃদ্ধি বাড়ায় কারনে প্রচুর ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার উদ্ভব হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের উচ্চ আদালত ও নি¤œ আদালতে মামলার পাহাড় ক্রমশই বাড়ছে। দীর্ঘসূত্রিতা, বিচারক সংকট ও নতুন মামলার প্রবাহে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। তবে আশার খবর হচ্ছে এখন ক্রমবর্ধমান হারে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে সালিশ বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিতে। এতে যেমন বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত স্বস্তি পাচ্ছেন, তেমনি আদালতের ওপর চাপও কিছুটা কমছে।দেওয়ানি বিরোধ, দেনাপাওনা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব , ভাড়া-বাড়ি সংক্রান্ত সমস্যা বা ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গ—এসব ক্ষেত্রে সালিশের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। আদালতের তত্ত্বাবধানে বিচারকরা পক্ষগুলোকে আলোচনায় বসান এবং অনেক সময় রায় না দিয়েই মামলা মীমাংসা হয়ে যায়। এতে সময় ও অর্থ দুই-ই সাশ্রয় হয়।
উচ্চ আদালত সহ নিম্ন আদালতে এখন প্রায় ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ২৬০টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের আদালত ব্যাবস্থায় মামলা নিষ্পত্তিতে এখনও লেগে যাচ্ছে একাধিক প্রজন্ম। মামলা জট ,বিচারক সংকট , আইনী জটিলতা , ও বার বার তারিখ পরিবর্তনের কারনে দীর্ঘসুত্রতা কমছে না। ফলে অনেকে জীবদ্দশায় বিচার না পেযে পরবর্তী প্রজন্মকে সেই বোঝা বইতে হচ্ছে। আইনজীবীদের অভিমত , পদ্ধতিগত কারনে মামলা দীর্ঘ জটযুক্ত হচ্ছে। সনাতনি পদ্ধতি গত কারনে মামলা জট বেড়ে যাচ্ছে। কারনে অনেক মামলার সংশ্লিষ্ট পক্ষদের মতে নোটিশ জরি হয় বছরের বছর বিলম্বে। অপরদিকে নোটিশ জারি যথাযথ না হবার কারনে পুনরায় নোটিশ জারী করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সেকশনে নোটিশ জারি হয়ে ফেরৎ আসায় পরে ভুল নথিতে এ বিষয় গুলো উল্লেখ করে নোট প্রদান করা হয় না। জারীর তথ্য সেকশনেই পড়ে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে হারিয়েও যায়। এ কারনে মামলা শুনানির জন্য প্রস্তত হতেই দীর্ঘবিলম্ব হয়। পুনরায মামলা কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় ভাবে আদালতের শুনানির তালিকায় অন্তভুক্ত অনিবার্য হলেও তা করা হয় না
আদালতের এখতিয়ার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনরায সেকশনে চলে যায়। নতুন করে তালিকা অন্তভুক্ত করতে শুনানি অন্তে দীর্ঘ সময় নেগে যায়। ফলে শুধুমাত্র আইনজীবীদের অভিযুক্ত করা যুক্তিযুক্ত নয়।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘সারা দেশের আদালতগুলোতে মামলাজট একটি বড় সমস্যা। বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার চাইতে আদালতে আসেন। তাদের সমস্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। আমাদের বার (আইনজীবী সমিতি) এবং বেঞ্চকে (বিচারকদের) এক হয়ে কাজ করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব এই জট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মামলাজট নিরসনসহ আরও কিছু বিষয়ে বর্তমান প্রধান বিচারপতি রোডম্যাপ দিয়েছেন। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। নয়তো এই জট দিন দিন বাড়তেই থাকবে।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না এই প্রতিনিধিকে বলেন, মামলাজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে সংকট বাড়ছেই। অন্তর্বতী সরকার বিচার বিভাগ সংস্কারের যে কমিশন গঠন করেছে তাতে কাঠামোগত সংস্কারকেই জোর দেওয়া হয়েছে। অতীতেও এ ধরনের সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁর মতে, লঘু অপরাধ বা অর্থদন্ডের মতো মামলাগুলোকে সংস্কারের আওতায় বাছাই করে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক বিচারাধীন মামলা কমে আসবে। মামলাজট নিরসনে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মতামত গ্রহণও জরুরি।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য, সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন মামলা জট ও প্রতিকার বিষয়ে এই প্রতিনিধিকে বলেন , মামলা জট নিরসনে প্রধান বিচারপতি একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। কয়েকটি বেঞ্চেকে নির্দেশ দিয়েছেন ২০০০ সালের আগের পুরাতন মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেটা নিষ্পত্তি করতে।এতে কিছুটা নিষ্কৃত পাওয়া যাবে। কিন্তু জজকোর্টে যে লাখ লাখ মামলা কি করে হবে। এ জন আমরা বিচার সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে রিপোর্ট দিয়েছিলাম আমাদের অবসর প্রাপ্ত যে সমস্ত বিচারক আছে তাদেরকে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেযা। কলকাতা আদালতে এখন ৬২ জন অবসর প্রাপ্ত বিচারক রয়েছেন। তারা পারলে আমরা কেন পারবো না। জরুরি ভিত্তিতে আইনমন্ত্রনালয় এদের নিয়োগ দিয়ে দেয় তা হলে ৬ মাসে দেখবেন তিন চার লাখ মামলা জজকোট থেকে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। ৬ মাসেই এটা সম্ভব। তিনি আরো বলেন ‘মামলাজটের অন্যতম কারণ মামলা দায়ের অনেক বেশি হচ্ছে। ছোট ছোট বিষয়েও মামলা হয়।’

