সবার দৃষ্টি এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দিকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আজই এ বিষয়ে রায় ঘোষনা করবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায় দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ রায় ঘোষনা করবেন। রায় ঘোষনার জন্য আজকে মামলাটি কার্যতালিকায় এক নম্বরে রাখা হয়েছে।
গত ২১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানোর বিষয়ে আপিল শুনানি শুরু হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য গত বছর ২৭ আগস্ট আবেদন করা হয়, যা আপিল বিভাগের অনুমোদন পায়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াত নেতা অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ কয়েকজন ব্যক্তি এ আবেদন করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ১৯৯৬ সালে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ১৩তম সংশোধনীর বৈধতা পুনর্বিবেচনা।সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আপিল বিভাগের রায়ে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসে, তবুও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন এ ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ নেই। বরং চতুর্দশ জাতীয় নির্বাচনই কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হতে পারে।
আইনজীবীদের মতামত ॥ সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, বাদীপক্ষ আদালতে জানিয়েছেন এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ চতুর্দশ জাতীয় নির্বাচন থেকে এ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। আদালত রায় দেবেন তাদের আবেদনের আলোকে।
আপিলপক্ষের আইনজীবী ড. শরীফ ভুইয়া বলেন, “ত্রয়োদশ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করতে গেলে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হবে। যদি ২০ নভেম্বর রায়ে কেয়ারটেকার ব্যবস্থা ফিরে আসে, তাহলে চতুর্দশ জাতীয় নির্বাচনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ॥ একটি আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরপেক্ষ সরকারের দাবির ফলেই ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী পাস করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালু হয়। এর অধীনে ১৯৯৬ সালের সপ্তম, ২০০১ সালের অষ্টম এবং ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেগুলো নিয়ে বিতর্ক তুলনামূলক কম ছিল।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক দাবি করে ২০০৪ সালে হাইকোর্টে রিট করা হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট তিন সদস্যের বেঞ্চ ১৩তম সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করেন। কিন্তু আপিল বিভাগ ২০১১ সালে রায় দিয়ে সংশোধনীটি বাতিল ঘোষণা করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ হয়। পরবর্তী সময়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাদ দেয় সরকার।দলীয় সরকারের অধীনে পরপর তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস পর ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
রিভিউ আবেদনের পটভূমি ॥ সরকার পরিবর্তনের পর ২০১১ সালের বিতর্কিত রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন। পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও আরও কয়েকজন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ গত ২৭ আগস্ট রিভিউর অনুমতি দেয়। পরে শুনানি শেষ করে ২০ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়।
আগামী নির্বাচন নিয়ে মতভেদ নেই॥ বিএনপির আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “যে রায়ই হোক, তা যেন ভবিষ্যৎ নির্বাচন থেকে কার্যকর হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচন এ রায়ের আওতায় হবে না।” জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, সংসদ ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান থাকলেও সংসদ তো এক বছরেরও বেশি সময় আগে ভেঙে গেছে। ফলে এখন চাহিদা থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সাংবিধানিকভাবে সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বক্তব্য দেন ২০১১ সালের রায়টি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য লেখা হয়েছিল, ফলে তা বহাল থাকার প্রয়োজন নেই। নতুন রায় পরবর্তী সরকারের সময় থেকে কার্যকর হলেও আইনি অসঙ্গতি হবে না।

